অন্তরের ব্যাধিসমূহ ও তাদের চিকিৎসা
অন্তর তিন ধরনের হয়ে থাকে-
(১) বিশুদ্ধ অন্তর, এটি আল্লাহ'র আদেশ-নিষেধ বিরোধী সব কামনা-বাসনা থেকে নিরাপদ এবং তিনি যা জানিয়ে দিয়েছেন সেগুলোর বিপরীত সকল সংশয়-সন্দেহ থেকেও নিরাপদ; যেমনিভাবে এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর ইবাদাত করা এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আ'লাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তি থেকে বিচার- মীমাংসা চাওয়া থেকেও নিরাপদ।
(২) মৃত অন্তর, এটি বিশুদ্ধ অন্তরের বিপরীত যেটির কোন প্রাণ নেই; এটি না জানে তার রবকে আর না তার ইবাদাত করে।
(৩) এমন এক অন্তর, যেটিতে কিছু জীবনীশক্তি আছে কিন্তু একটি ত্রুটিও আছে। সুতরাং এই অন্তরে আল্লাহ'র প্রতি ভালোবাসা, তার প্রতি ঈমান, ইখলাস আর তাওয়াক্কুল থাকে; এগুলো অন্তরের জীবিত থাকার জন্য অপরিহার্য বিষয়। এই অন্তরে নিরর্থক ও অসার কামনা-বাসনার প্রতি ভালোবাসা আর এগুলোর প্রতি অগ্রাধিকারও থাকে, আরো থাকে ঘৃণ্য নীতি ও আচার-আচরণ; এগুলোর কারনে অন্তর মৃত হয়ে পড়ে। এই অন্তরটি জীবিত ও মৃত এ দুটো অবস্থার মধ্যে ক্রমাগত দুলতে থাকে।
সুতরাং প্রথম প্রকারের অন্তর হল জীবিত, নম্র, কোমল ও ভদ্র অন্তর। দ্বিতীয় প্রকারের অন্তরটি শুকিয়ে যাওয়া, কঠিন ও মৃত অন্তর। তৃতীয় প্রকারের অন্তর হল ব্যাধিগ্রস্ত অন্তর, একে নিরাপদও করা যেতে পারে অথবা এর ধ্বংসও মোহরাঙ্কিত হয়ে যেতে পারে।
অন্তরের সকল ব্যাধিই কামনা-বাসনা আর সন্দেহ-সংশয়ের উপর গড়ে উঠে। অন্তরের জীবনীশক্তি ও এর প্রদীপ্তি এর সকল কল্যাণের কারন, আর এর মৃত্যু ও অন্ধকারময়তা এর সকল পাপ ও অমঙ্গলের কারন।
সত্য সম্পর্কে জানা, একে ভালোবাসা আর অন্য যেকোন কিছুর উপর একে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া অন্তর কখনোই জীবিত ও পরিশুদ্ধ হবে না। অন্তরের জন্য কোন সুখ- আনন্দ বা সংশোধন নেই, যদি না এটি আল্লাহ'র ইবাদাত করাকে এর একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে পরিণত করে এবং কেবলমাত্র আল্লাহকেই কামনা করে।
অন্তরের পরিশুদ্ধি, তাওবা করা, সব ধরনের মিথ্যা ভালোবাসা আর ঘৃণ্য আচার-আচরণ বর্জন করা ছাড়া অন্তর কখনোই যথাযথ হবে না। পাপের প্রতি উৎসাহিত করা অন্তরের বিরুদ্ধে জিহাদ করা আর একে হিসাবনিকাশের সম্মুখীন করা, জীন জাতির অন্তর্ভুক্ত শয়তানদের চক্রান্ত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য জেনে আল্লাহকে আঁকড়িয়ে ধরে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এবং মহিমান্বিত আল্লাহ'র স্মরণ করার মাধ্যমে আর তাদের থেকে আল্লাহ'র নিকট আশ্রয় চাওয়ার মাধ্যমে নিজেকে রক্ষা করা- এগুলো করা ছাড়া এটি কখনোই অর্জিত হবে না।
দুটি মৌলিক বিষয়ের উপর কেন্দ্র করে অন্তর ত্রুটিপূর্ণ ও দুর্বল হয়ে যায়, এগুলো হলো ইলমের বিকৃতি ও নিয়্যতের বিকৃতি। এগুলো দুটো ধ্বংসাত্মক ব্যাধি ক্রোধ ও পথভ্রষ্টতার দিকে পালাক্রমে পরিচালিত করে। পথভ্রষ্টতা হল নিয়্যুতের বিকৃতির শেষ পরিনাম। সুতরাং এই দুটো ব্যাধিই হল অন্তরকে দুর্দশাগ্রস্তকারী সকল ব্যাধির রাজা।
এর চিকিৎসা নির্ভর করে ইলমের উপর ভিত্তি করা হিদায়াতের (পথনির্দেশনা) উপর। ইলমের উপর ভিত্তি করা হিদায়াত হল সত্যকে জানা আর সেটির অনুসরণ করা। পুরো কুরআনই হল এই দুটো ব্যাধিসহ অন্যান্য সকল ব্যাধির চিকিৎসা আর কুরআনই পরিপূর্ণ হিদায়াত ধারণ করে।
*চিকিৎসা সম্পর্কে কুরআনে বর্ণিত আয়াত:
মহান আল্লাহ বলেন,
وَيَشْفِ صُدُورَ قَوْمٍ مُّؤْمِنِينَ (١٤)
এবং তিনি মুমিনদের অন্তরসমূহের চিকিৎসা করবেন।" (সূরা তাওবাহ, ৯:১৪)
وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (۸۰)
"এবং যখন আমি অসুস্থ হই, তিনি আমার চিকিৎসা করেন।" (সূরা শু'আরা, ২৬: ৮০)
يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَتْكُم مَّوْعِظَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَشِفَاءٌ لِّمَا فِي الصُّدُورِ وَهُدًى
وَرَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِينَ (٥٧)
"হে মানবজাতি, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে উপদেশ এসেছে, আর এসেছে অন্তরসমূহের সকল রোগের একটি চিকিৎসা, এবং (এটি) মুমিনদের জন্য হিদায়াত (পথপ্রদর্শক) ও রহমত।" (সূরা ইউনুস, ১০: ৫৭)
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِّلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا (۸۲)
"এবং আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যা মুমিনদের জন্য একটি চিকিৎসা ও রহমত " (সূরা ইসরা', ১৭: ৮২)
هُوَ لِلَّذِينَ آمَنُوا هُدًى وَشِفَاءً .
"এটি (কুরআন) আল্লাহ'র বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য হিদায়াত আর একটি চিকিৎসা।" (সূরা ফুসসিলাত, ৪১:৪৪)
يَخْرُجُ مِن بُطُونِهَا شَرَابٌ مُّخْتَلِفٌ أَلْوَانُهُ فِيهِ شِفَاءٌ لِّلنَّاسِ
"তাদের উদর থেকে নির্গত হয় বিবিধ বর্ণের পানীয় (মধু), যাতে মানুষের জন্য রয়েছে একটি চিকিৎসা।"
(সূরা নাহল,১৬ : ৬৯)
.jpg)