উম্মাহর ব্যাধি ও আল্লাহর মদদ লাভের উপায়।
আল্লাহর মদদ লাভের উপায় হলো, উম্মাহর ব্যাধি নির্ণয় করে তার প্রতিকার করা।
সংক্ষেপে উম্মাহর ব্যাধিসমূহ নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
১. ইসলামের প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে অনবগতি
২. মুসলমানদের অনৈক্য
৩. দুনিয়াপ্রীতি ও বিলাসী জীবনযাপন
৪. জিহাদ বর্জন
৫. জিহাদের বাহ্যিক প্রস্তুতিগ্রহণে অবহেলা
৬. মুসলমানদের নেতৃত্ব সংকট
৭. শত্রুকে মিত্র বানানো।
৮. হতাশা ও মনোবলহীনতা
৯. অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদান
১০. পরামর্শ বর্জন
আমরা যদি আল্লাহর মদদ লাভ করতে চাই তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান রাখতে হবে।
আমরা ব্যাধি সম্পর্কে প্রতিটি বিষয় বিস্তারিত আলোচনা করবো ইন শা আল্লাহ্।
প্রথম ব্যাধি: ইসলামের প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে অনবগতি
ইসলামের একটি মূলনীতি হলো-
إِنْ تَنْصُرُوا اللَّهَ يَنْصُرْكُمْ
"তোমরা যদি আল্লাহকে [আল্লাহর দ্বীনকে সহযোগিতা করো, আল্লাহ তোমাদের সহযোগিতা করবেন। (সূরা মোহাম্মদ: ৭)
আল্লাহকে সাহায্য করা অর্থ হলো, তার শরীয়ত মেনে চলা, ইসলামী জীবনব্যবস্থা মতো জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহর বিধান ছেড়ে দেওয়া, কুরআল-সুন্নাহকে উপেক্ষা করা এবং পশ্চিমাবিশ্ব প্রণীত বিধান ও সমাজব্যবস্থা
মেনে নেওয়াই হলো বিপদাপদ ও বালা-মসিবতের মূল কারণ। তাতারসহ সকল অনৈসলামিক শক্তি থেকে ইসলাম ও মুসলমানরা তখনই রেহাই পাবে, যখন তাদের মাঝে সেই ব্যক্তির শুভাগমন ঘটবে, যিনি ওয়া ইসলামা...হ [হায়!! ইসলা...ম!] বলে ডাক দেবেন। আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুতয রহ.-এর এই বাণীর মাধ্যেমে আমাদের ওই পতাকাতলে সমবেত হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যেই পতাকাতলে আশ্রয়গ্রহণকারী সকলেই বিজয়ের স্বাদ ভোগ করে।
ইসলামকে উপেক্ষা করে সেনাপতি সৈন্যবাহিনীকে যতই সুসংগঠিত করুক না কেন, সফলতা ও বিজয় কখনো আসবে না। আমরা আমাদের ভেতর-বাহির যদি তার সঙে সম্পৃক্ত না করি, তবে তিনি কখনোই আমাদের দিকে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করবেন না। আমাদের ভেতরে মুসলমান হতে হবে, বাহিরেও মুসলমান হতে হবে। আমাদের রাজনীতি, আমাদের অর্থনীতিকে ইসলামায়ন করতে হবে। আমাদের জীবন, আমাদের মরণ, আমাদের সেনাপতি, আমাদের সৈন্যবাহিনী সবই একনিষ্ঠ ইসলামী সংবিধান অনুযায়ী পরি
চালিত হতে হবে। একথা সুস্পষ্টভাষায় বলতে কোনো দ্বিধা নেই। এতে লজ্জার কোনোকিছু নেই। বরং যারা দ্বীনের পরোয়া করে না, বস্তুত তাদেরই লজ্জিত হওয়া উচিৎ।
সুবহানাল্লাহ! আমাদের অবস্থা দেখুন-
বর্তমান সমাজের অবস্থা হলো, যারা দ্বীনের কথা বলে, তাকে সাবধানে কথা বলতে হয়, কথা-কাজে তাকে সাবধানী হতে হয়না জানি সুযোগ পেলে অন্যরা তার কথার অপব্যাখ্যা করে বসে। পক্ষান্তরে যারা অন্যায়-অপকর্মের কথা বলে বেড়ায়, তাদের কোনো নিয়মনীতি মানতে হয়না। তারা সমাজে বে- পরোয়। যে জাতির অবস্থা হলো এমন, সে জাতি কিভাবে বিজয় লাভ করবে বলুন?!
সে জাতি কিভাবে সফল হবে, যে জাতির আলেমগণ হক-কথা বলতে লজ্জা পায়, কিন্তু পাপিষ্ঠ-পাপাচাররা প্রকাশ্যে গুনাহ ও অন্যায়ের প্রচার করতে লজ্জাবোধ করে না!
হে মুসলিম ভাইরা, বিষয়টি নিয়ে একটু ভাবুন। মুসলমানদের এই মানসিক বিপর্যই হলো মুসলিম দেশসমূহে শত্রুদের প্রতিষ্ঠা পাওয়ার অন্যতম কারণ।
দ্বিতীয় ব্যাধি: মুসলমানদের অনৈক্য
আমরা তাতারীদের ইতিহাস পাঠ করে দেখতে পেয়েছি, তাতারীদের আক্রমণ যেমন অবিরাম ছিলো, মুসলিম ভূখণ্ডসমূহে যেমন তাতারীত্রাস ছড়িয়ে পরেছিলো, অনুরূপ মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহও ছিলো তুঙ্গে। মুসলমানরা নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতো। নিজেদের দ্বন্দ্ব-কলহের পিছে পড়ে শত্রুদের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পেতো না। আর এই সুযোগে শত্রুরা আক্রমণ করে বসত। মুসলমানদের পরস্পরিক সংঘাত ব্যর্থতা ও পরাজয়ের অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
"তোমরা নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না। তাহলে তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। তোমরা ধৈর্যধারণ করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।
(সূরা আনফাল: ৪৬)
তৃতীয় ব্যাধি: দুনিয়াপ্রীতি ও বিলাসী জীবনযাপন
তাতারীদের যুগে মুসলমানদের চোখে দুনিয়া অনেক বড় হয়ে গিয়েছিল বর্তমান মুসলিম জাতিরও একই অবস্থা। একটি বৃহৎ প্রজন্ম কেবল দুনিয়ার জন্যই বেড়ে উঠছে। অথচ দুনিয়া হলো সবচেয়ে তুচ্ছ, নগণ্য বিষয়। সবাই কেবল সম্পদ সঞ্চয়, সুন্দর জীবনযাপন ও দুনিয়াদারির জন্যই বেঁচে আছে। ভোগ-বিলাস, খাবার-দাবার, গাড়ি-বাড়িই আজ মুসলিমসমাজের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা আজ বিধ্বংসী গান-বাজনা, মিউজিক-বাদ্যে উপভোগ করে। এভাবেই মুসলমানরা আজ দুনিয়ায় ডুবে রয়েছে। অধিকাংশ যুবক কুরআনের চেয়ে বেশি অশ্লীল গান মুখস্ত করে। অধিকাংশ যুবক গায়ক- গায়িকা ও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জাবনী সবিস্তারে অধ্যয়ন করে। নিজ দেশের বা ভিনদেশের খেলোয়ারদের জীবনী তারা খুব ভালো জানে। অথচ মুসলিমসমাজের কাণ্ডারী উলামা, বীরযোদ্ধাদের জীবনী সামান্যও জানে না। তারা সাহাবীদের জীবনীও জানে না। এমনকি রাসূল সা.-এর জীবনীও জানেনা!!
এ কি এমন ব্যাধি নয়, যার আশু চিকিৎসা দরকার।
ধ্বংসের সুস্পষ্ট কারণসমূহের অন্যতম কারণ হলো দুনিয়া ভোগ-বিলাস। আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে বলেন-
وَإِذَا أَرَدْنَا أَنْ نُهْلِكَ قَرْيَةً أَمَرْنَا مُتْرَفِيهَا فَفَسَقُوا فِيهَا فَحَقَّ عَلَيْهَا الْقَوْلُ فَدَمَّرْنَاهَا تَدْمِيرًا
"আমি যখন কোনো জনপদকে ধ্বংস করতে চাই, তখন তার সমৃদ্ধিশালী ব্যক্তিবর্গকে সৎকর্ম করতে আদেশ দিই। কিন্তু তারা অসৎকর্ম করে। ফলে তাদের প্রতি আমার সিদ্ধান্ত অবধারিত হয় এবং আমি তা সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করি।
( সূরা বনী ইসরাইল: ১৬)
ভোগ-বিলাসী মানসিকতা আজ মুসলমানদের মাঝে ব্যাপকার ধারণ করেছে; এমনকি তা গরিব-মিসকীনদের মাঝেও শুরু হয়েছে। অনেক মানুষ এমন আছে, যে দিনের খাবার জোগাতে পারে না, কিন্তু সিগারেট ছাড়া তার চলে না। অনেকে এমন আছে, পরার কাপড় ব্যবস্থা করতে হিমশিম খায়, কিন্তু কফি- হাওজের আড্ডা সে ত্যাগ করতে পারে না। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ ব্যয় করতে পারে না, কিন্তু চলচ্চিত্র-সিনেমা নিয়মিত দেখে!
এমন ভোগ-বিলাসী মানসিকতার মানুষ কিভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াবে! যারা সফলাত ও উন্নতির চরম-শিখরে আরোহণ করতে চায়, তারা কিছুতেই এমন বিলাসী হতে পারে না।
চতুর্থ ব্যাধি: জিহাদ বর্জন
দুনিয়ার লোভ ও সীমাতিরিক্ত বিলাসিতার পরিণামের মতোই জিহাদ বর্জনের ফলাফল অবশ্যম্ভাবী। আজ মুসলমানরা সর্বাধিক অধঃপতিত জাতির মতো জীবনযাপনে সন্তুষ্ট। মুসলমানরা শত্রুদের সালাম [শান্তিচুক্তি]কে মেনে নিয়েছে যা মূলত ইস্তেসলাম [আত্মসমপর্ণ]। তারা আত্মসমর্পণের জীবন বেছে নিয়েছে।
মুসলমানরা তাতারীযুগে বোঝেনি যেমন বর্তমান মুসলমানরা বুঝতে পারছে না-যে, মুসলমানদের অধিকার আদায়ের একমাত্র মৌলিক ও কার্যকরী পথ হলো, জিহাদ। শান্তিচুক্তি বা সন্ধিচুক্তি যদিও কখনো কখনো কল্যাণকর, তবে
যখন মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার খর্ব হবে, তাদের রক্তপাত হবে অন্যায়ভাবে, তাদের কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করা হবে, তাদের দ্বীনধর্ম নিয়ে বিদ্রূপ করা হবে, তাদের মান-সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হবে তখন শান্তিচুক্তির কোনো অবস্থাতেই কল্যাণকর হয় না।
মুসলমানরা ভোলতে বসেছে, পূর্ণ অধিকার পুনরুদ্ধারের পূর্বে শান্তিচুক্তি হতে পারে না। শান্তিচুক্তি তখনই হতে পারে, যখন আমরা থাকবো সম্মানিত এবং যখন শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করলে আমরা চুক্তি বাতিলের অধিকার সংরক্ষণ করব। এ ছাড়া শান্তিচুক্তি তো আত্মসমর্পণ বৈ কিছু নয়। এমন শাক্তিচুক্তি শরীয়তসম্মত নয়।
মুসলমানদের বোঝা উচিৎ, 'জিহাদ' শব্দটি কোনো দোষণীয় শব্দ নয়, যা লুকিয়ে রাখতে হবে বা তা প্রকাশে লজ্জা পেতে হবে। 'জিহাদ' এমন কোনো নিকৃষ্ট শব্দ নয়, যা শিক্ষাসিলেবাস, পত্র-পত্রিকা, বই-পত্র, কিতাবাদি থেকে মুছে ফেলতে হবে। জিহাদ তো ইসলামের শীর্ষ চূড়া। জিহাদ ইসলামের অন্যতম প্রধান আমল। ইসলামের শত্রু কিংবা ভাব শত্রুরা তা মানুক বা না- মানুক। জিহাদ শব্দটি নানা রূপে কুরআনে কারীমে ত্রিশবারের অধিক ব্যবহৃত হয়েছে। অনুরূপ কিতাল [যুদ্ধ তথা মুসলিম উম্মাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা] শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে।
এসকল আয়াত নিয়ে আমরা কোথায় যাবো? এই আয়াতগুলো নিয়ে কি আমরা পালাবো?
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ حَرِضِ الْمُؤْمِنِينَ عَلَى الْقِتَالِ
'হে নবী, মুমিনদের যুদ্ধের প্রতি উৎসাহিত করুন।
(সূরা আনফাল : ৬৫)
আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত আয়াতটি নিয়ে আমরা কোথায় পালাবো?
আল্লাহ তা'আলা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قَاتِلُوا الَّذِينَ يَلُونَكُمْ مِنَ الْكُفَّارِ وَلْيَجِدُوا فِيكُمْ غِلْظَةٌ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
“হে মুমিনগণ, কাফেরদের মধ্যে যারা তোমাদের নিকটবর্তী তাদের সাথে যুদ্ধ করো এবং তারা যেনো তোমাদের মধ্যে কঠোরতা দেখতে পায়। জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
(সূরা তওবা: ১২৩)
কুরআনের এই বাণীটি নিয়ে আমরা কোথায় পালাব?
وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
"তোমরা মুশরিকদের সাথে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করো। যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে যুদ্ধ করে থাকে এবং মনে রেখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
(সূরা তওবা: ৩৬)
হে আমার ভাই-বোনেরা, জিহাদ ছেড়ে দিয়ে কতদিন পর্যন্ত নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন? কতদিন পর্যন্ত নিজের মান-সম্মান ধরে রাখতে পারবেন? প্রাচ্যে-পশ্চিমে যে সকল মুসলমান নির্মমভাবে ধ্বংস হচ্ছে, তাদেরকে কোন নীতিমালা ও সংবিধানের আলোকে জিহাদ থেকে দূরে রাখবেন?
আমি মনে করি, এই ব্যাধি-জিহাদ বর্জন, জিহাদের কথা না বলা ও জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণ না করার ব্যাধি-এই জাতির অন্যতম ব্যাধি। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে তারা কখনোই জিহাদ ব্যতীত সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। আমাদের তো ইতিহাস থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করতে হবে।
পঞ্চম ব্যাধি: জিহাদের বাহ্যিক প্রস্তুতিগ্রহণে অবহেলা
তাতারীরা জয়লাভের যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণে সচেষ্ট ছিলো। সৈন্যবাহিনী প্রস্তুতকরণ, অস্ত্র সংগ্রহ, পরিকল্পনাগ্রহণ, ছক আঁকা তথা জয়লাভের যাবতীয় প্রস্তুতি তিনি গ্রহণ করতেন।
অথচ তখন মুসলমানরা অন্য উপত্যকায় বসবাস করত। এদিকে তাদের কোনো খেয়াল ছিলো না।
মুসলিম বাহিনী ছিলো অবহেলিত, তাদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্রচালনা বিষয়ে কোনো গুরুত্বারোপ করা হতো না। মুসলমানগণ যুদ্ধের প্রস্তুতিগ্রহণে খুব অবহেলা করতো। বাহ্যত তাদের শ্রেণিবিন্যাসও ছিলো অনেকের জন্য লাঞ্ছনার। তাদের
উন্নতির পেছনে পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হতো না। অথচ প্রাসাদ নির্মাণ, পার্ক- বিনোদন কেন্দ্র উন্নয়নের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হতো। সামরিকপ্রস্তুতির খাতে সামান্য অর্থ ব্যয়িত হতো না।
যে জাতির সামরিকপ্রস্তুতি হাল এতো নাজেহাল, তার পরাজয় তো অবশ্যম্ভাবী, সময়ের ব্যাপার। মুসলিম জাতি প্রস্তুতি ব্যতিত কখনো দাঁড়াতে পারে না। বাহ্যিক প্রস্তুতি ছেড়ে দিয়ে শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করার কোনো অর্থ হয় না। বাহ্যিক প্রস্তুতিও তাওাক্কুলের অন্তর্ভুক্ত। এটা ভালোভাবে মনে রাখার দরকার।
ষষ্ঠ ব্যাধি: মুসলমানদের নেতৃত্ব সংকট
বক্তৃতা ও উপদেশ প্রদানের চেয়ে যোগ্য নেতা কর্তৃক প্রতিপালন হাজার গুন উত্তম। সৈন্যবাহিনী যখন যোগ্য নেতাশূন্য হয়ে পড়ে, তখন অসহায়ত্ব অনুভব
করতে শুরু করে। জিহাদের জন্য হাজার বক্তৃতা প্রদান কোনো কাজে আসবে না, যদি সেনাপতি বিপদের মুখোমুখি হওয়ার সময় হার মেনে বসে।
যদি সেনাপতি রাজপ্রাসাদে ভোগবিলাসে মত্ত থাকে, নিজ বিলাসিতায় হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে, তাহলে সৈন্যবাহিনীকে ধৈর্যধারণ, অল্পেতুষ্টি ও দুনিয়াবিমুখতার হাজার উপদেশ কোনো কাজে আসবে না।
যতি নেতা, নামাজ না পড়েন, যদি নেতার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্র না হয়, তবে এমন নেতা তার প্রজা সাধারণকে উত্তম চরিত্রের যতই বয়ান করুন না কেন তা সামান্য ফলপ্রসু হবে না।
জাতি কিভাবে আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়তকে আঁকড়ে ধরবে যদি দেশপ্রধানের আমল-আখলাকের অবস্থা এমন হয়!!
যে নেতা যুদ্ধ-জিহাদ, আমল-আখলাক, ধৈর্য-সবর, ন্যায়বিচার, দুনিয়াবিমুখতা ইত্যাদি কল্যাণকর কাজে নিজে অগ্রগামী না হন, তার সৈন্যবাহিনী তাকে কিভাবে রক্ষা করবে! বিপদাপদে তো তারা নেতার সঙ্গ ছেড়ে দেবে!! আমাদের ইতিহাস ভুলে গেলে চলবে না-ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
সপ্তম ব্যাধি: শত্রুকে মিত্র বানানো
তাতারীযুগে অধিকাংশ মুসলিম নেতা শত্রুবাহিনীকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, তারা মৌলিকভাবে নিজেদের ও দেশবাসীর
আত্মরক্ষা করছে। অথচ তারা শরয়ীতের দৃষ্টিতে ও যৌক্তিকভাবেও তাদের এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো। তারা ভুলের শিকার ছিল। জিহাদের প্রয়োজন থাকার পরও জিহাদ থেকে দূরে প্রকাশ্য ভুল। আবার দেশবাসীকে এর মাধ্যমে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া আরেক ভুল। উপরন্তু শত্রুদের মিত্র বানানো তৃতীয় ভুল। তারা একসাথে এই তিন ভুলে নিমজ্জিত ছিল।
আল্লাহ রব্বুল আলামীন কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদী ও খ্রিস্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পর পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদের-ই একজন বলে বিবেচিত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা জালেম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না। ( সূরা মায়েদা: ৫১)
এটি আল্লাহ রব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট ভয়াবহ হুঁশিয়ারবাণী। ওই ব্যক্তির চেযে অধিক নির্বোধ বা দুর্বল ঈমানের অধিকারী-আর কে আছে, যে এই হুঁশিয়ারবাণী শোনেও এর দিকে দৃষ্টি দেয় না।
অষ্ঠম ব্যাধি: হতাশা ও মনোবলহীনতা
হতাশ জাতি কখনো জয়লাভ করতে পারে না। হতাশা, নিরাশা মুমিনের গুণ নয়। আল্লাহ রব্বুল আলামীন বলেন-
وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
"তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়োনা। আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কেবল কাফের সম্প্রদায়ই নিরাশ হয়।
(সূরা ইউসুফ: ৮৭)
তাতারীরা আমেরিকানদের মতো কর্মপদ্ধতি অবলম্বন করেছিল। তারা নিজেদেরকে মহান ও শক্তিশালী-সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। আর মুসলমানদের ভীত করে রেখেছিল। তাদের মনোবল হারানোর জন্য যাবতীয় পদক্ষেপগ্রহণ করেছিল-ইতিপূর্বে তা আমরা উল্লেখ
করেছি। তারা মুসলমানদের সামনে একথা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিল যে, মুক্তির একমাত্র পথ হলো বিনয় ও আত্মসমর্পণ। আমরা তাতারীদের ইতিহাস সবিস্তারে পাঠ করলাম। আমরা দেখেছি কুতয
রহ.-এর হাতে তাদের শোচনীয় পরাজয়। মুসলমানদের এই অভাবনীয় জয়ের মূল কারণ হলো, ইমাম কুতয রহ. মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ হতাশাকে দূর করে তাদের মাঝে আশার আলো জ্বালিয়েছিলেন। তাদের সুপ্তশক্তিকে জাগিয়ে তোলোছিলেন। তিনি তাদের শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাতারীরা আল্লাহর অন্য সৃষ্টি মতো সৃষ্টিজীব। তারা আল্লাহকে পরাজিত করতে পারবেনা। সুতরাং যদি মুসলমানরা আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে, তাহলে তাদের সাথে পৃথিবীর কোনো শক্তি পেরে উঠবে না। চাই সে শক্তি তাতার হোক বা আমেরিকা, ইহুদী হোক বা খ্রিস্টান। শেষ জয় নিঃসন্দেহে মুসলমানদের। মুসলমানদের এই মানসিক প্রস্তুতি ব্যতীত জয় অসম্ভব।
নবম ব্যাধি: অযোগ্যকে দায়িত্ব প্রদান
আমরা বাগদাদের প্রথম পরাজয়ে দেখেছি, কীভাবে অযোগ্যের হাতে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়, কীভাবে আমানত ধ্বংস করা হয়? যেভাবে মাঝে তাকওয়াস্বল্পতা আছে, তাদের আরও আত্মিক পরিশুদ্ধতার প্রয়োজন, তাদেরকে কীভাবে রাষ্ট্রের উচ্চপদসমূহের দায়িত্ব দেওয়া হয়? আল্লহর শপথ! এটি ছিল মহাবিপদ!!
যখন ক্ষমতায় কেবল নিকটবর্তী পরিচিতজনরা যেতে পারে, যখন সুদ-ঘুষ ব্যতীত পদ পাওয়া যায় না, মুসলিম দেশসমূহে এমন পরিস্থিতি তো সত্যিই ভয়াবহ।
আপনি যখন দেখবেন, যোগ্যতার বিবেচনা ছেড়ে মানুষ কাছের মানুষকে প্রাধান্য দেয়, চাকরি-আসন-ক্ষমতা কেনা-বেচা হয়, পক্ষান্তরে যোগ্যরা পিছিয়ে পড়ে, তাদের কোনো মূল্যায়ন করা হয় না, তখন মনে রাখবেন, বিজয় অসম্ভব। এমন জাতির উন্নতি কখনো আশা করা যায়না।
তাতারীদের যুগে মুসলমানরা যেমন অধঃপতিত গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল, আজও মুসলমানরা তা-ই হতে যাচ্ছে। আজও রাষ্ট্রীয় মূল্যবান পদগুলোয় অযোগ্যরা বসে আছে। তারা নিশ্চয়ই এমন পদ্ধতিতে এখানে এসেছে, যা আল্লাহ তা'আলা পসন্দ করেন না।
যোগ্য ব্যক্তিকে যোগ্যস্থানে বসানো ও যোগ্যদের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে সফলতা ও বিজয় অসম্ভব।
দশম ব্যাধি: পরামর্শ বর্জন
ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা অন্যতম মূলনীতি হলো মশওয়ারা বা পরাশর্ম। যে ব্যক্তি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে পরাশর্মভিত্তিক পদক্ষেপগ্রহণ করে না, সে জাতির সম্ভাবনাকে নষ্ট করলো, আম্বিয়া আ.-এর মত ও পথবরুদ্ধ আমল করল। সে তার অনুসারী প্রজাদের অন্তরে কাপুরুষতা ঢেলে দিল। এমন নেতা একের পর এক ভুলের শিকার হবে নিঃসন্দেহে। সর্বোপরি কথা হল, সে আল্লাহর নির্দেশের খেলাফ করল। আল্লাহ তা'আলা কুরআনে কারীমে সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন-
وَشَاوِرْهُمْ فِي الْأَمْرِ
"হে নবী, কাজে-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো।
( সূরা আল ইমরান: ১৫৯)
পরামর্শ বলতে এখানে প্রকৃত কার্যকরী পরামর্শকে বোঝানে হয়েছে। কেবল ভারহীন অমূল্যবান পরামর্শের কথা বোঝানো হয়নি। এই ছিলো দশম ব্যাধি। এই দশটি ব্যাধি মুসলমানদের তাতারীদের অধীনস্থ করেছিলো। পৃথিবীর শুরু থেকে আজ অবধি মুসলমানরা যতবার পরাজিত হয়েছে, এর মূল কারণ এই দশটি। মনে রাখবেন, আমরা কখনো শত্রু শক্তিশালী বলে আর আমরা দুর্বল হিসেবে পরাজিত হয়নি। আমরা পরাজিত হয়েছি উল্লিখিত ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে। আল্লাহর মদদলাভের উপায় ও বিজয়ের পথ
আল্লাহর মদদ লাভের উপায় খুব সহজ ও সুস্পষ্ট। তা হলো, উম্মাহর যে দশটি ব্যাধির কথা আমরা উল্লেখ করলাম, যেগুলোর যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া। নিম্নোক্ত দশটি বিষয় অবলম্বন করলে আল্লাহর মদদ লাভ করা খুব সহজ।
যথা -
১. আল্লাহর দিকে পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবর্তন করা।
২. মুসলমানদের ঐক্য গঠন।
৩. দুনিয়াবিমুখতা, বিলাসিতা বর্জন ও জান্নাতের প্রতি ঈমান।
৪. জাতিকে জিহাদ ও মউত ফি সাবিলিল্লাহর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা।
৫. জিহাদের বৈষয়িক প্রস্তুতি যথা, অস্ত্র সরবরাহ, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি ইত্যাদি গ্রহণ করা।
৬. যোগ্য নেতৃত্ব সৃষ্টি করা।
৭. শত্রুকে পরোয়া না করা। শত্রু ও মিত্রের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করা।
৮. মুসলিম উম্মাহর মাঝে আশার প্রাণ সঞ্চালন করা। তাদের হতাশা ও মনোবলহীনতা দূর করা।
৯. যোগ্যকে দায়িত্ব প্রদান করা। যোগ্যতার পরিচয় হলো আমানতদারিতা ও শক্তিশালী হওয়া।
১০. যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ, যার মাধ্যমে সর্বোত্তম মতামত গ্রহণ করা হয়। আল্লাহর দরবারে সবিনয় ফরিয়াদ, তিনি যেনো আমাদের গোটা জীবন তার পথে ব্যয় করার তৌফিক দান করেন। আমাদের যাবতীয় কথা-বার্তা কাজ- কর্মকে সাহাবায়ে কেরামের কথা-বার্তা কাজ-কর্মের অনুরূপ বানান। তাদের মতো যেনো বলার তৌফিক দেন-
نحن الذين بايعوا محمداً على الجهاد ما بقينا أبداً
“আমরা সেইসব লোক, যারা মুহাম্মদের হাতে মৃত্যু পর্যন্ত জিহাদ করার বায়াত গ্রহণ করেছি।"
-আমীন ।
তাতারীদের ইতিহাস বই থেকে নেওয়া।
@লেখক ড. রাগেব সারজানী।
.jpg)